দহনের দিনে জোছনার ফুল
By আফিফা পারভীন
Publisher: চলন্তিকা
Language: N/A
Format: Unknown
Pages: N/A
ISBN: N/A
৳770.00
30% OFFIn Stock
ফ্ল্যাপ:
“সদ্য মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে বেরুনো এক তরুণী, যে সবসময় বাবা-মায়ের সতর্ক নজরদারি ও ভালোবাসার ঘেরাটোপে জীবনের এতটা দিন কাটিয়েছে, তার ইচ্ছে হলো স্বাধীনভাবে কিছু কাজ করার। পরিবারের সাথে অনেক মানসিক লড়াইয়ের পর সে রওনা হলো দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এক অজানা ও অচেনা গন্তব্যে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল জাতিগত নিপীড়ন ও দমনের মুখে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এক অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীদের চাপ মোকাবেলা করতে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অভাব যেখানে চরম হয়, ন্যায়-নীতি সেখানে জানালা দিয়ে পালায়। দারিদ্র্য ও অভাবের কষাঘাতে কয়েক লাখ মানুষ অধ্যুষিত একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দিনের পর দিন নানা রকমের অপরাধের আঁতুরঘরে পরিণত হয়েছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য এক অকুতোভয় যুবককে মায়াময় পরিবার ও আপনজনদের ফেলে চলে আসতে হয় এই অপরাধপূর্ণ এলাকায়। পথিমধ্যে কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ সেই ডাক্তার তরুণী ও এই অকুতোভয় যুবকের অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ হয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। নিয়তি নির্দেশিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলার পথে তাদের অনুভূতির রং বদল ঘটে। ক্ষণিকের পথসঙ্গী থেকে তারা হয়ে উঠে মনোসঙ্গী। কিন্তু যাদের জীবনের মূলমন্ত্র 'কান্ট্রি কামস ফার্স্ট', তাদের কাছে ব্যক্তিপ্রেমের চেয়ে দেশপ্রেম সবসময়ই অগ্রাধিকার পায়। সেই অকুতোভয় যুবক, নব্য তরুণী ডাক্তার ও তাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা আরও কিছু মানুষের জীবনালেখ্য 'দহনের দিনে জোছনার ফুল। "
আমরা উপন্যাস কেন পড়ি? কারণ উপন্যাস মানুষকে এক আলাদা অনুভূতি দেয়, যা জীবনের সঙ্গে সংযোগ ঘটায়। জীবনের নানান দিক, অনুভূতির অনেক রঙের সাথে পরিচিত করায়। মানুষ প্রবৃত্তিগতভাবেই আবেগপ্রবণ। মানুষের মনের মধ্য থাকে অজস্র কথামালা। লেখক সেই কথামালাকে শৈল্পিকভাবে যখন প্রকাশ করে তখন পাঠক উপন্যাস পড়ে ভাবে, "আরে! এ তো আমারই মনে কথা।" এভাবেই মানুষ নিজেকে জানে, নিজের মনের কথার সাথে পরিচিত হয়, নিজের চেনাজানা গণ্ডির বাইরেও অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে শেখে। নিজেকে ভালোবাসতে ও ভালোবাসাকে সাজাতে শেখায় একটা ভালো উপন্যাস। এসব ব্যাপারগুলোতে লেখক আফিফা পারভীনের জুড়ি মেলা ভার। তিনি আপনার ভেতরের সমস্ত অনুভূতিকে নিংড়ে দেওয়ার পর সেখানে প্রতিস্থাপিত করবে মুগ্ধতা, ভালোবাসা ও বিহ্বলতা। তার লেখা পাঠকের জন্য উন্মোচিত করে অজানাকে জানার নতুন নতুন পথ। লেখার ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকে জীবন সম্পর্কিত নানান দর্শন ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার বর্ণনা। প্রকৃতির সৌন্দর্য তার লেখায় ধরা দেয় জীবন্ত হয়ে। এছাড়াও প্রকৃতি ও মানব জীবনের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি শব্দের বুননে পাঠককে নিয়ে যান এক অন্য ভুবনে যেখানে তার লেখায় চরিত্রগুলো হয়ে উঠে পাঠকের একান্ত আপন কেউ।
আফিফা পারভীন এর লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, মানব জীবনের আদি অনুভূতি ভালোবাসার বহু ধরনের সাথে শালীন ও মার্জিত শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচয় ঘটানো। তার লেখায় ভালোবাসার স্নিগ্ধ ও সুন্দর রূপ দারুণভাবে ফুটে উঠে। এই উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই উপন্যাসে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার চমৎকার উদাহরণ ছিল প্রতিটি চরিত্র। ভালোবাসা এমনই এক চিরন্তন ও শ্বাশত অনুভূতি যার আবেদন কখনো শেষ হয় না। সভ্যতা উন্নত হয়েছে, মানুষ গুহা ছেড়ে লোকালয়ে বাস শুরু করেছে, শহর-নগর-বন্দরের পরিবর্তন হয়েছে অথচ ভালোবাসার অনুভূতি এখনোও সেই আছে। এই পৃথিবী যতদিন থাকবে, ভালোবাসার অনুভূতি ততদিন একই থাকবে। এই উপন্যাসের আসিফ আহসান খান, আদিব আহসান খান, আদিত্য আহসান খান, জারিফ করিম, নুসরাত জাহান ও আধিরাসহ আরও বেশ কিছু ভালোবাসার নিদর্শনের যারা শুধু ভালোবাসেনি, সেই ভালোবাসাকে আজন্ম মনের গোপন কুঠুরিতে লালন পালন করেছে, যত্ন করেছে।
প্রচ্ছদ ও নামকরণ : মধ্য রাতের গভীর নীল আকাশের মধ্যে উজ্জ্বল চাঁদ এবং তার নিচে বিছিয়ে থাকা জারুল, কৃষ্ণচূড়া ও অমলতাসের দিকে নজর পড়লেই স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে মন। ব্যাক কাভারে সূর্যের তীব্র আলোতেও স্নিগ্ধ একগুচ্ছ জারুল ফুল। সূর্যের দহনে আপনি যতই পুড়ে যান না কেন, ফুলের এই স্নিগ্ধরূপ আপনার সকল ক্লান্তি দূর করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মানুষের জীবন যখন নানান দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, আশা নিরাশার দোলাচালে দুল্যমান থাকে ঠিক তখনই ভালোবাসার একটু পরশ জীবনকে আবার বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখে। যা এই প্রচ্ছদে প্রতীয়মান।
কাহিনী সারসংক্ষেপ : নাগরিক কোলাহলে মুখরিত এক সকালে ব্যস্ত প্লাটফর্মে অগণিত মানুষের ভীড়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বিপরীতমুখী দু'জন নর-নারীর প্রথম সাক্ষাত। একজন সূর্যের মতো তেজোদ্দীপ্ত, অপরজন চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ, সরল ও নরম। একজন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে চলা মানব আরেকজন জীবনের জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞাত এক মানবী। তবে দু'জনের মধ্য সাধারণ একটা মিল হলো, উভয়েই তাদের জীবনের নিজ নিজ নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। জীবনের তাগিদে ছুটে চলা বিচিত্র সব মানুষের মধ্য অচেনা সেই মানব একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে ধরা দিয়েছে মানবীর প্রয়োজনীয় সময়ে। খুনসুটি দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনায় উন্মোচিত হয়েছে জীবনের নানান অনুভূতির রূপ। সামনে এসেছে একের পর এক চরিত্র। বর্ণিত হয়েছে একেকটি চরিত্র ও ঘটনার প্রেক্ষাপট। বইয়ের অর্ধাংশকাল বেশ শান্তভাবে আনন্দ নিয়ে এগিয়ে গেলেও এরপর থেকে উন্মোচিত হয়েছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, বাস্তবতার নোংরা ও বিভিন্ন কঠিন দিক। সেই অনিশ্চয়তাকে অবলম্বন করেই আলাদা হয়েছে উপরোক্ত মানব মানবীর জীবন পথের রেখা। একজন দেশের জন্য ও আরেকজন দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য নিবেদন করেছে নিজেদের সময় ও জীবন। কাহিনির বিন্যাসের সাথে সাথে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এসেছে নানান চরিত্র, উপন্যাসে রেখে গেছে তাদের গভীর ছাপ। একটি রঙিন নকশীকাঁথায় যেমন হরেক রঙের সুতোর ছোট-বড় অসংখ্য ফোঁড় মিলে একেকটি জীবন বর্ণিল হয়ে উঠে, এই উপন্যাসেও তা-ই হয়েছে।
পাঠপ্রতিক্রিয়া : লেখক আফিফা পারভীনের দশম বই 'দহনের দিনে জোছনার ফুল'। উপন্যাসটি মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার নিয়ে লেখার কারণে সেখানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সুনিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য লেখিকার শব্দের বুননে হয়ে উঠেছে আরও প্রাণবন্ত ও প্রশান্তিময়। আবার তার বর্ণনার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নির্মম জীবন উঠে এসেছে সাবলীলভাবে যাতে পাঠক শব্দের মধ্য দিয়ে ঘটনাস্থল নির্দ্বিধায় দেখতে ও অনুভব করতে পারে। শব্দের জাদুর ছন্দে ও বাক্যের সাবলীলতায় মন কখনোও হয়েছে মুগ্ধ, কখনোও বিভোর আবার কখনোও চরম আক্রোশে মন হয়েছে অশান্ত। ভীষণ সাবলীল লেখা তবে শুধুমাত্র অনুভূতিহীন হয়ে রিডিং পড়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই লেখাই পাঠককে অনুভূতির মধ্য টেনে নিয়ে যাবে।
উপাদান ও ঘটনা:
পরিবার: তিনটি পরিবারকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে চলেছে গোটা উপন্যাস। একটি পরিবার প্রতিনিধিত্ব করে সমাজের সাধারণ এক গোষ্ঠীর, আরেকটি পরিবার রুচি, সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক এবং অপরটি সমাজে লুকায়িত মু খোশ পরে থাকা কিছু মানুষ নামক অমা নুষের বহিঃপ্রকাশ।
বাবা: উপন্যাসে মোট চারটি বাবার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আধিরার বাবা, আদিব সাহেবের বাবা, আদিত্যের বাবা এবং ইশমামের বাবা। আধিরার বাবা মধ্যবিত্ত পরিবারের চিন্তাভাবনার ধারক ও বাহক, আদিব সাহেবের বাবা একজন নীতিবান ও আদর্শের প্রতিক, আদিত্যের বাবা গর্ব, সম্মান ও বন্ধুর প্রতিক যাকে এক কথায় বলা যায় গার্ডিয়ান এঞ্জেল এবং ইশমামের বাবা। যেমন বাবা তার তেমন ছেলে।
মা: মা তো মা-ই হয়। মায়ের মধ্য কখনোও আলাদা বিশেষণের প্রয়োজন হয়না তবে সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান তাদের চিন্তাচেতনায় ব্যপক প্রভাব ফেলে। আধিরার মা একজন সাধারণ গৃহিনী যিনি সংসারের জন্য নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দেন, আদিত্যের মা- যিনি সংসার, স্বামী, সন্তানসহ নিজেকেও সময় দেন এবং ইশমামের হতভাগা মা। মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় কোনো বিভেদ না থাকলেও মানুষের ভাগ্যেরেখার বিভেদের একমাত্র উদাহরণ ইশমামের মা।
ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ:
মুক্তিযু দ্ধ: খুব অল্প একটু বর্ননাতেই উঠে এসেছে এই যু দ্ধের ভয়া বহতা। কতটা ব র্বর তার সাথে কেড়ে নিয়েছে একটি সুস্থ, সুন্দর পরিবার, কারও প্রিয়জন, কারও মা। ৭১ শুধুমাত্র ৭১ নয়, এটি হারানোর গল্প, অত্যাচার ও বর্বরোচিত এক ইতিহাসের সাক্ষী।
রোহিঙ্গা ইস্যু: উপন্যাসটি মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দিক কেন্দ্র করেই লেখা। এদের পিছিয়ে পড়ার ইতিহাস এবং নিজ দেশ ছেড়ে পরদেশে এসে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের বসবাসের ইতিহাস বেশ পুরোনো ও বিভী ষিকাময়। জীবীকা নির্বাহ করার তাগিদে একের পর এক অন্যায় কাজে জড়িত, অবৈধ ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়া তাদের নিত্যদিনের এক গল্প। এই যে রোহিঙ্গা ইস্যু এটা আমি জানতাম শুধুমাত্র ২০১৭ সালের ঘটনা থেকে কিন্তু এদের ইতিহাস এরচেয়েও বেশি পুরনো, বেশি গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক। লেখিকা সমস্যা শুরুর সেই অতীত সময় থেকে আজকের বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত সংক্ষেপে এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে, যারা এই সম্পর্কে আগে বিস্তারিত জানে না, তারাও এই উপন্যাস পড়লে বেশকিছু ব্যাপার জানতে পারবে।
চরিত্র বিশ্লেষণ:
আদিত্য আহসান খান: আদিত্য! যে তার নামের মতোই তেজোময় একজন মানুষ। পেশা জীবনে সফলতার পাশাপাশি একজন ছেলে, ভাই, নাতি, প্রেমিক ও বন্ধু। ন্যায়ের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মতো অটল, নদীর মতো শান্ত আবার সমুদ্রের মতো উত্তাল। সম্পর্কের যত্নের ক্ষেত্রে একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর প্রেমিক হিসেবে বাঁধভাঙা নদীর মতো ভ য়ংকর। সে কখনো আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত, আবার কখনো শান্ত দীঘির মতো স্নিগ্ধ।
আসিফ আহসান খান: আসিফ আহসান খান সম্পর্কে আদিত্য আহসান খানের দাদা এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এই বৃদ্ধ মানুষটি পরিবারের জন্য বটগাছস্বরূপ। যার ছায়ায় আগলে রেখেছে তার গোটা প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধের করাল গ্রাসে সবকিছু হারিয়ে এক সন্তান নিয়েই যার একটি পরিপূর্ণ সংসার গড়ার স্বপ্ন। তার কথা মনে হলে শ্রদ্ধায় মন হয় স্নিগ্ধ। ভালোবাসার মানুষের যত্ন ও তার দেওয়া উপহার যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেই যার অপেক্ষা।
আদিব আহসান খান: সম্পর্কে আদিত্যের বাবা। একজন একনিষ্ঠ প্রেমিক ও স্বামী। পুরো উপন্যাসে সবচেয়ে বেশি ভালোলাগা ও শ্রদ্ধা মেশানো চরিত্র।
আফসার আহমেদ: ইন্সুইরেন্স কোম্পানীর মাঝারি গোছের কর্মকর্তা আফসার আহমেদ সম্পর্কে আধিরার বাবা এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ধারণার ধারক ও বাহক। তার চিন্তাভাবনা শুরু দুই মেয়েকে ভালোভাবে পড়াশোনা করানো এবং শেষ তাদের উপযুক্ত পাত্রের হাতে সমর্পিত করায়। এতে কোনো অন্যায় নেই তবে সে চাইলেই মেয়েদের জন্য একটি স্ট্রং সাপোর্ট হতে পারতো। যাই হোক পৃথিবীর সব বাবাই যে আদিব আহসান খানের মতো হবে তার কোনো কথা নেই।
জারিফ করিম: একে নিয়ে না বললেই নয়। লম্বা ঢেউ খেলানো চুলগুলো দিয়ে যেকোনো মুহুর্তে যেকোনো নারীর মনে ঢেউ তুলতে সক্ষম এই ব্যক্তিটি অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনার শি কার হয়ে স্বপ্নের প্রফেশন থেকে ছিটলে পড়লেও একজন সফল মানুষ, একজন একনিষ্ঠ প্রেমিক ও বন্ধু। পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা ও এক সমুদ্র ভালোবাসা যার প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
সাদমান: অল্প সময়ের জন্য উপস্থিত হলেও বেশ গভীর প্রভাব ফেলেছে। লাভ এট ফার্স্ট সাইট এবং ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের অনুকূলে না পেয়ে মেজাজের খেই হারানো মানুষের প্রতিচ্ছবি। ভালোবাসার মানুষ সর্বাবস্থায়, সর্বোপরি সম্মানের। পরিস্থিতি যাই হোক- সে ভালোবাসার মানুষ। তার সম্মান মানেই নিজের সম্মান। কিন্তু সবাই কী আর আদিত্য কিংবা জারিফ হয়?
বোবা সালাম: রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতে এক মোটামুটি গোছের নেতা হিসেবে পরিচিত। এক মা ও এক বিশ্বস্ত সহচরী ইসমাইলসহ আরও কয়েকজন নিয়েই যার দল। মা দক পাচার, চোরাকারবারি আড়ালে থাকলেও সে একজন সফল জেলে। যার বামন হয়েও যাঁদে হাত দেওয়ার শখ হলেও নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে খুব সাবধানে। এমন তো নয় যে তাদের জীবিকা নির্বাহের ধরণ অনৈতিক বলেই তারা খারাপ। তাদেরও মন আছে, সেই মনে ভালোবাসার জন্ম নেয়, তারাও ভালোবাসে কিন্তু সমাজের চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সভ্যতার ফারাক কী চাইলেই গুটানো সম্ভব হয়, হয়না। তবে এই চরিত্রকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। এই পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত মানুষটির ঠোঁটেও তো কেউ ভীষণ যত্ন নিয়ে চুমো দেয়, তাত গায়ে লেগে থাকা রক্ত মুছে দেয়। আসলে সবই ভালোবাসার খেলা। সে যেমন সভ্য জগতে মানুষের হৃদয়ের আলো, তেমনি অভব্য জগতের মাফিয়াদেরও মনের আলো।
আধিরা আহমেদ: জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে না জানা মেয়েটি তার নামের মতোই স্নিগ্ধ, প্রশান্তি ও শান্তিদায়ক। আত্মমর্যাদায় পরিপূর্ণ এই মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করে বাস্তবতার কষাঘাতে টিকে থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়ে যার চলার পথ শুরু। জীবন চলে জীবনের নিয়মে। এই চলার পথে আসে নানান বাঁক। সে বাঁকে বাঁকে সৃষ্টি হয় নতুন গল্পের। কখনোও ভালো আবার কখনোও তিক্ত তবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ধীর মনোবলই পারে সব বাধা অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে।
নুসরাত জাহান: কী বলা যায় এই চরিত্র নিয়ে? কিচ্ছুনা। এই চরিত্র বিশ্লেষণ করার মতো শব্দ আমার জানা নেই তবে তার জন্য রয়েছে হৃদয়ের গহীন থেকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান ও আনুগত্যের ঘোষণা। তবে এই চরিত্রের জীবন থেকে উপলব্ধি করা যায় অনেক কিছু। প্রয়োজনের সময় যে বাচ্চা পাখি মায়ের অপেক্ষায় কাটায়, ওড়া শিখতেই সেই পাখি ঘর ভুল যায়। যাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন, নিজের স্বপ্ন হারালেন দিনশেষে তারাই তাকে একা করে দিলেন। তবে যে নিজেকে একবার গড়ে তুলেছে তাকে ভাঙবে এমন সাধ্যি কার?
আনিশা চৌধুরী: রুচিশীল ও আভিজাত্যের প্রতীক এই ভদ্র মহিলা সম্পর্কে আদিত্য ও আদৃতার মা। পারফেক্টশনিস্ট কী? ইনি তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী উদাহরণ।
আহিরা সুলতানা : সাধারণ গড়পড়তা বাঙালি গৃহবধু। বলার মতো বিশেষ কিছু নেই তবে একজন চমৎকার মা, স্ত্রী ও শাশুড়ীর বউমা। এমন নয় যে সবাইকেই অফিস আদালত করতে হবে, বাসায় বসেও যে সাবলম্বী হওয়া যায়, আহিরা আহমেদ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আদৃতা আহসান খান: একে নিয়ে না বললেই নয়। মোমের পুতুলের মতো ভীষণ সংবেদনশীল এই মেয়েটি বাবা মায়ের রাজকন্যা, দাদার আদরের নাতনি, ও ভাইয়ের আদরের বোন। তবে ভাগ্য বিধাতা তার মনের এই সংবেদনশীলতাকে খানখান করে একজন শক্তিশালী নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করতেই হয়তো তাকে ফেলেছিল এক মহা সমুদ্রের অকূলপাথারে। তবে শেষ ভালো যার সব ভালো তার আলহামদুলিল্লাহ।
ইশমাম: বাহ্যিক সৌন্দর্য মানুষের জীবনে সব নয়, তার প্রমাণ এই চরিত্র। সুন্দরের আড়ালেও কতটা কুৎসিত ও বিকৃত স্বভাব লুকিয়ে থাকতে পারে এটা একে পড়লে জানা যায়। মানুষের নোংরা প্রবৃত্তির লাগামহীন আচরণ তাকে কোথায় নিয়ে যায় ইশমামের কাজকর্ম সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। পাপ কখনোও ঢেকে রাখা যায় না আর সত্য কখনোও চাপা থাকে না।
এছাড়া পুরো উপন্যাসজুড়ে রয়েছে অসংখ্য ভালোলাগার জায়গা ও চরিত্র। আদিত্য আধিরার খুনসুটি, আদিত্যের রেড এডিকশন, কথায় কথায় আধিরাকে রাগিয়ে দেওয়া, জঙ্গলমহল পর্ব, আনিশা চৌধুরীর তার ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন, গ্রীক দেবীর প্রতিমূর্তি ক্যাপ্টেন তানিয়া, আদিব সাহেবের তার ছেলেকে সাপোর্ট দেওয়া... উপন্যাসের প্রতিটি শব্দ উপভোগ্য। এছাড়া উপন্যাসের শেষে রয়েছে লেখিকার নিয়মিত পাঠকের জন্য এক অভাবনীয় সারপ্রাইজ যা একই সাথে পাঠকের তৃষিত মনকে শান্তি দেবে ও আনন্দের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
No reviews yet. Be the first to review this book!